প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের চারপাশে ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত জামায়াতি সিন্ডিকেট শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলি এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে লন্ডনপন্থী এই বলয়ের অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন। এই বলয়ের প্রভাবের কারণে দেশের গণমাধ্যম এবং দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করা বিএনপির ছাত্রসংগঠনের অনেক নেতাকর্মী কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। মাকড়সার জালের মতো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে এই বলয়ের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েকজন মন্ত্রী, লন্ডনভিত্তিক দুইজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা এবং প্রেস উইংয়ের একটি অংশও এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সালেহ শিবলি ছাত্রশিবির করতেন। প্রেস সচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া সালেহ শিবলির শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তিনি ঢাকার তামিরুল মিল্লাতে পড়াশোনা করেছিলেন, যেটিকে শিবিরের আতুরঘর বলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজে বক্তব্য বা স্ক্রিপ্ট প্রস্তুত করতে সক্ষম নন। তার বক্তব্য ও লেখালেখির পেছনে রয়েছেন আরেক জামায়াতঘেঁষা সাংবাদিক আনোয়ার আলদীন-তিনিও তামিরুল মিল্লাত থেকে উঠে আসা। আনোয়ার আলদীনের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের নানা বিতর্কিত অধ্যায় অতীতে ঢাকাজুড়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। সালেহ শিবলি কলকাতার উপ-প্রেস সচিব দায়িত্ব পালণের পর লন্ডনে চলে যান। গড়ে তোলেন জামায়াতি সিন্ডিকেট। দীর্ঘ ১৫ বছরে তিনি একাধিকবার দেশে আসেন বাঁধা ছাড়াই। বিএনপি না করলেও হঠাৎ বিএনপির তৎকালীণ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছের হয়ে উঠেন।
যেভাবে উত্থান শিবলির : সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব আশিক ইসলামের মাধ্যমে লন্ডনে তারেক রহমানের সাথে পরিচয় হয়। একইভাবে এই সিন্ডিকেটে ঢুকে পড়েন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর এবং শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তারেক রহমানের বক্তব্য আদালত কর্তৃক প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দিলে তখন নতুন একটি অনলাইন প্লাটফর্ম খোলা হয়। সেটির নাম ছিলো ‘আন্দোলন নিউজ’। এই আন্দোলন নিউজে কাজ করবার জন্য সালেহ শিবলি এবং ভিডিও গ্রাফার খালিদকে প্রস্তাব করলে বিনাবেতনে তা করতে অস্বীকৃতি জানান। পরবর্তীতে বেতন দেয়ার শর্র্তে শিবলি এবং খালেদকে আন্দোলন নিউজের দায়িত্ব দেয়া হয়। পরবর্তীতে এটির জনপ্রিয়তা পেলে লন্ডন ব্যবসায়ী কামাল সাহেব ফান্ডিং করেন। দীর্ঘসময় বিএনপির বেতনভুক্ত শিবলি আশিক ইসলাম আমেরিকা চলে গেলে তার অনুপস্থিতি তারেক রহমানের পক্ষ থেকে মিডিয়ার দায়িত্ব নিয়ে নেন। তারেক রহমানের আশপাশে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। একটি স্টুডিও বানান, যেখান থেকে পরবর্তীতে তারেক রহমানের বিভিন্ন ভিডিও বার্তা করা হতো। তারেক রহমানের সাথে নেতাকর্মীদের সাক্ষাত বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। লন্ডনে বেকার শিবলি ভাতাভুক্ত একজন সাংবাদিক। সেই ভাতা এবং বাণিজ্যের টাকায় আশিসান জীবন যাপন করেন। একাধিক নারীর সাথে সম্পর্কে জড়ান। তাকে সহযোগিতা করেন আরেক জামায়াতি সাংবাদিক ব্যারিস্টার গিয়াসউদ্দিন রিমন।
শিবলির ক্যাশিয়ার কে সেই আশিক মাহমুদ : শিবলি ক্যাশিয়ার হিসাবে পরিচিত একাত্তর টিভির আশিক মাহমুদ। ফ্যাসিবাদের দোসর আশিক একাত্তর টিভির মালিক মোজা বাবুর পিএস ছিলেন। পরবর্তীতে লন্ডনে গিয়ে শিবলির ক্যাশিয়ার হয়ে যান। গড়ে তোলেন ব্যবসা বাণিজ্য। আশিক মাহমুদকে দিয়ে গ্লোসারিজ, মোবাইল এক্সসরিজ এবং রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করান শিবলি। ৫ আগস্ট পট পরিবর্র্তনের পর শিবলির সাথেই আশিক মাহমুদকে দেশে ফেরান। রাজনৈতিক চাপ দিয়ে সময়টিভিতে যোগদান করান শিবলি। আশিক মাহমুদ ঢাকার বিভিন্ন মদের পার্টিতে উপস্থিত হয়ে অহংকার করেন বলেন, আমি শিবলি ভাইয়ের জন্য দেশে এসেছি। বাণিজ্য, ব্যাংক লোন, তদবির করাই তার মূল দায়িত্ব। একইসাথে কারোর চরিত্রহরণের জন্য আশিক মাহমুদকে দায়িত্ব দেন শিবলি।
জামায়াত-শিবির প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে শিবলি: শিবলির হাত ধরেই সরকারে বিভিন্ন সেক্টরে জামায়াত-শিবির পুর্নবাসিত হয়েছে। তারা একপ্রকার দেশ চালাচ্ছে। প্রেস উইংয়ে অতিরিক্ত প্রেস-সচিব হিসাবে সালেহ শিবলি চেয়েছিলেন জামায়াতি আনোয়ার আলদীনকে নিয়োগ দিতে। তীব চাপের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী শেখ হাসিনার স্পিচ রাইটার নজরুলের অতি ঘনিষ্ঠ মাহফুজ সাহেবকে স্পিচ রাইটার হিসাবে নিয়োগ দিতে সক্ষম হন। তিনি ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিবাদের দোসর হিসাবে চাকুরিচ্যুত হয়েছিলেন। ছাত্র জীবনে শিবিরের রাজনীতি করবার অভিযোগ গুরুতর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিবির ক্যাডার সাহদাত স্বাধীনকে সুকৌশলে প্রেস উইং নিয়োগ দেন। স্বাধীণ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবির পরিচালিত ফোকাস কোচিংয়ের পরিচালক ছিলেন। রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ে চিহ্নিত আরেক শিবির নেতা লন্ডনী মাহফুজকে সহকারী প্রেস সচিব হিসাবে নিয়োগ দেন। জাপানে তার বন্ধু প্রবাসী ফকির সেলিমকে নিয়োগ দেয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন। তার আরেক বন্ধু মুজিবুরকে লন্ডনের প্রেস মিনিস্টিার করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। গিয়াসউদ্দিন রিমন এবং আনোয়ার আলদীনকে সরকারে অন্তর্ভূক্ত করতে না পারায় তাদের দুজনের পক্ষ থেকে প্রচন্ড চাপে আছেন।
বিনা টাকায় থেকেছেন বনানীর অভিজাত হোটেল পার্লে : বিনা টাকায় বনানীতে অবস্থিত হোটেল পার্র্লে টানা তিনমাস থেকেছেন। একটি রুমের প্রতিদিনের ভাড়াই ছিলো ৭৮ ডলার। এই হোটেলটির মালিক হলেন বৈশাখী টিভির সিইও অশোক চৌধুুরী। তার মাধ্যমে বিনাভাড়ায় এই হোটেলে থেকে আনন্দ ফূর্তি করেছেন। টাকা নিয়েছেন বিএনপির দলীয় ফান্ড থেকে। তার উত্তরাতে রয়েছেন মদের আড্ডাখানা। যেখানে তিনি নিয়মিত মদের পার্টি দেন। বিগত সময়ে আওয়ামী লীগপন্থী সাংবাদিকদের নামে মামলা বা হয়রানী করে বিপুল টাকা কামিয়েছেন। এক সময় মামলা বাণিজ্য ছিলো তাদের আয়ের অন্যতম উৎস। কারণ সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা রিমনের সাথে মিলিয়ে তারা এই বাণিজ্য করতেন।
ডিবিসি দখলের চক্রান্ত : শাহাবুদ্দিন চৌধুরী নামের শিবলির এক বন্ধুকে দিয়ে ডিবিসি নিউজ দখলের পায়তার করছে শিবলী ও রিমন গং, শিবলি তার মদ ও নারী সাপ্লায়ার এবং ক্যাশিয়ার আশিক মাহমুদকে ডিবিসিতে বসাতে চাপ দিচ্ছে মালিক পক্ষকে। এবং ১০% শেয়ার লিখে দিতে ডিবিসির মালিককে দুদকের মামলার ভয় দেখাচ্ছে।
এই সিন্ডিকেটের ক্রমবর্ধমান দাপট বিএনপিকে একটি গভীর রাজনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দেশে ফেরার পর যাঁরা তারেক রহমানকে ঘিরে রেখেছেন, তাঁদের বড় অংশই জামায়াতপন্থী রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। শিবলি ও রিমন ছাত্রজীবনে কখনো ছাত্রদলের রাজনীতি করেননি। দলের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টও তাদের পাওয়া যায় না। অথচ বাস্তবতা হলো-আজ তারাই বিএনপির চালিকা শক্তি। প্রধানমন্ত্রীর সাথে কাদের সাক্ষাৎ হবে-এই সিদ্ধান্তগুলোও কার্যত তাদের হাতেই কেন্দ্রীভূত। তারেক রহমানের মেয়ে জাইমাকেও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এই সিন্ডিকেট। বিএনপির ভেতরে অবস্থান করেই তারা দীর্ঘমেয়াদি জামায়াতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে-এমন অভিযোগ এখন আর গোপন নয়।
মনোনয়ন বাণিজ্যই শিবলি-রিমন গংয়ের সবচেয়ে বড় অপারেশন। ঢাকা-১০ আসনে রবিউল ইসলাম রবির মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। দিনাজপুরে ব্যারিস্টার জামানকে মনোনয়ন দেওয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সালেহ শিবলির বিরুদ্ধে। যশোরের আবুল হোসেন আজাদকেও টাকার বিনিময় মনোনয়ন ভাগিয়ে দেয়া হয়। একইভাবে বাগেরহাটের লায়ন ফরিদও তাদের লোক। অন্তত ১০টি আসনে মনোনয়ন বাণিজ্যের সঙ্গে এই সিন্ডিকেট সরাসরি যুক্ত ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। লন্ডনে অবস্থানকালে চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়ার নামেও তারা নিয়মিত অর্থ আদায় করেছে।
ব্যারিস্টার গিয়াসউদ্দিন রিমনের অতীতও বিতর্কমুক্ত নয়। ‘সংগ্রাম’-এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু-যেখানে শিবিরঘনিষ্ঠতা ছাড়া রিপোর্টার হওয়া প্রায় অসম্ভব। এরপর ইনকিলাব, পরে যুগান্তর। যুগান্তরের সুবাদে পুলিশের চাকরি পাওয়া এবং পরে দুর্নীতির অভিযোগে চাকরি হারানোর ঘটনাকে রাজনৈতিক হয়রানি হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি তারেক রহমানের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। বর্তমানে তিনি বসুন্ধরা গ্রুপের ডিএমডি পরিচয়ে মাসিক বিপুল সুবিধা গ্রহণ করছেন। পাশাপাশি আরও একটি প্রতিষ্ঠানে এডভাইজার হিসেবে মোটা অঙ্কের সম্মানী নিচ্ছেন। শ্বশুরকে মনোনয়ন পাইয়ে দিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন এবং নারায়ণগঞ্জে বিএনপির প্রার্থী মাসুদুজ্জামানকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে রাখতে সন্ত্রাসী ও প্রশাসনিক শক্তি ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-প্রকৃত ছাত্রদল ও দীর্ঘদিনের আন্দোলনকারী নেতাকর্মীরা আজ সাবেক শিবিরপন্থীদের হাতে নিয়মিত হেনস্তার শিকার। ছাত্রদলের প্রোডাক্টদের কৌশলে শিবির বানিয়ে ফায়দা লুটছেন তারা। ১৭ বছরের রাজপথের কর্মীরা চরম হতাশ ও ক্ষুব্ধ। এই সিন্ডিকেটের এজেন্ডা অব্যাহত থাকলে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিএনপিকে টিকিয়ে রাখতে হলে তারেক রহমানকে দ্রুত ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিবলি গংয়ের প্রভাব থেকে দলকে মুক্ত না করা হলে, সামনে বিএনপির জন্য আরও বড় রাজনৈতিক বিপর্যয় অপেক্ষা করছে-এটাই এখন দলের ভেতরের বাস্তবতা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



