স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইউনুস আলী

এপিএস হয়ে অর্ধশত কোটি টাকা ইনকাম, নির্বাচনের আগে গিফট পাওয়া ১২০টি আইফোন বিক্রি

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মো. ইউনুস আলীর ওপর অভিযোগের শেষ নেই। নারী কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে নিয়োগ বাণিজ্য; দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি ও পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়াসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে নাম জড়িয়ে এই কর্মকর্তার। এতো সব অভিযোগের পরও স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর এপিএস পদে বহাল থাকায় উঠেছে নানা প্রশ্ন।


‎অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে এলজিইডির (স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর) কর্মকর্তা বদলিতে প্রভাব বিস্তার, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ, অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন এবং ব্যক্তিগত আচরণসংক্রান্ত নানা দাবি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলজিইডির কর্মকর্তারা।

‎সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এলজিইডির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা বদলির ক্ষেত্রে এপিএস ইউনুসের প্রভাব রয়েছে।
‎তাদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও বদলির বিষয়ে তার মতামত কার্যকর হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপ থাকে।

‎নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলজিইডির কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বদলি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক সময় প্রশাসনিক অস্বস্তির সৃষ্টি হয়। এ ধরনের অভিযোগের কারণে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

‎টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। কয়েকজন ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবি, কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র আহ্বানের আগেই নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক ও প্রকৌশলীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, দরপত্র অনলাইনে প্রকাশের আগেই সম্ভাব্য কার্যাদেশ কারা পেতে পারেন, সে বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়া হয়।

‎সূত্র মতে, অভিনব কৌশলে টেন্ডার হাতিয়ে তা পছন্দের ঠিকাদারদের দেন ইউনুস। টেন্ডার লাইভে উঠার আগেই প্রকল্প পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে চাপের মুখে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে বাধ্য করে।
‎সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যদি কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।

‎তাদের মতে, ই-জিপি ব্যবস্থা চালুর অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল মানবীয় হস্তক্ষেপ কমানো। ফলে অভিযোগের সত্যতা নিরূপণে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। ‎এদিকে অভিযুক্ত এপিএসকে ঘিরে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে।

‎অভিযোগকারীদের দাবি, বর্তমানে তিনি শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক। আয় বহির্ভূত এই সম্পদের উৎস দুর্নীতি। ‎এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নানা দাবি প্রচারিত হচ্ছে।

একবার মলি (ছদ্মনাম) নামের এক মেয়ের সঙ্গে অনৈতিক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকায় হাতে নাতে আটক করে এলাকাবাসী। ‎এছাড়াও মন্ত্রীর এপিএস হওয়ার পরপর একবার গুলশানে মাতাল অবস্থায় ওই মেয়ের সাথে মারামারির ঘটনাও ঘটিয়েছে এপিএস মো. ইউনুস আলী।

‎একটি নির্দিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগে ১২০টি আইফোন বিক্রি করছে। সব আইফোনগুলো গিফট পাওয়া। এই ফোনগুলো উত্তরা রাজলক্ষ্মী ও তার পাশের মোবাইল মার্কেটে বিক্রি করে ইউনুস। এতোগুলো আইফোন এক সঙ্গে বিক্রি করা নিয়ে সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

‎সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, আর অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সুনাম রক্ষার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

‎আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতি, টেন্ডার কারসাজি কিংবা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো অভিযোগ, প্রাপ্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ভারসাম্যপূর্ণভাবে তুলে ধরা; অভিযোগকে তদন্তের আগেই প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা নয়।

‎এই প্রতিবেদনের জন্য অভিযুক্ত এপিএস ইউনুসের সঙ্গে ফোন ও বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিষয় :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইউনুস আলী

এপিএস হয়ে অর্ধশত কোটি টাকা ইনকাম, নির্বাচনের আগে গিফট পাওয়া ১২০টি আইফোন বিক্রি

সময় : ০৬:৪৭:৫৯ অপরাহ্ণ, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মো. ইউনুস আলীর ওপর অভিযোগের শেষ নেই। নারী কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে নিয়োগ বাণিজ্য; দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি ও পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়াসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে নাম জড়িয়ে এই কর্মকর্তার। এতো সব অভিযোগের পরও স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর এপিএস পদে বহাল থাকায় উঠেছে নানা প্রশ্ন।


‎অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে এলজিইডির (স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর) কর্মকর্তা বদলিতে প্রভাব বিস্তার, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ, অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন এবং ব্যক্তিগত আচরণসংক্রান্ত নানা দাবি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলজিইডির কর্মকর্তারা।

‎সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এলজিইডির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা বদলির ক্ষেত্রে এপিএস ইউনুসের প্রভাব রয়েছে।
‎তাদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও বদলির বিষয়ে তার মতামত কার্যকর হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপ থাকে।

‎নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলজিইডির কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বদলি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক সময় প্রশাসনিক অস্বস্তির সৃষ্টি হয়। এ ধরনের অভিযোগের কারণে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

‎টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। কয়েকজন ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবি, কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র আহ্বানের আগেই নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক ও প্রকৌশলীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, দরপত্র অনলাইনে প্রকাশের আগেই সম্ভাব্য কার্যাদেশ কারা পেতে পারেন, সে বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়া হয়।

‎সূত্র মতে, অভিনব কৌশলে টেন্ডার হাতিয়ে তা পছন্দের ঠিকাদারদের দেন ইউনুস। টেন্ডার লাইভে উঠার আগেই প্রকল্প পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে চাপের মুখে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে বাধ্য করে।
‎সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যদি কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।

‎তাদের মতে, ই-জিপি ব্যবস্থা চালুর অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল মানবীয় হস্তক্ষেপ কমানো। ফলে অভিযোগের সত্যতা নিরূপণে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। ‎এদিকে অভিযুক্ত এপিএসকে ঘিরে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে।

‎অভিযোগকারীদের দাবি, বর্তমানে তিনি শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক। আয় বহির্ভূত এই সম্পদের উৎস দুর্নীতি। ‎এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নানা দাবি প্রচারিত হচ্ছে।

একবার মলি (ছদ্মনাম) নামের এক মেয়ের সঙ্গে অনৈতিক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকায় হাতে নাতে আটক করে এলাকাবাসী। ‎এছাড়াও মন্ত্রীর এপিএস হওয়ার পরপর একবার গুলশানে মাতাল অবস্থায় ওই মেয়ের সাথে মারামারির ঘটনাও ঘটিয়েছে এপিএস মো. ইউনুস আলী।

‎একটি নির্দিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগে ১২০টি আইফোন বিক্রি করছে। সব আইফোনগুলো গিফট পাওয়া। এই ফোনগুলো উত্তরা রাজলক্ষ্মী ও তার পাশের মোবাইল মার্কেটে বিক্রি করে ইউনুস। এতোগুলো আইফোন এক সঙ্গে বিক্রি করা নিয়ে সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

‎সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, আর অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সুনাম রক্ষার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

‎আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতি, টেন্ডার কারসাজি কিংবা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো অভিযোগ, প্রাপ্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ভারসাম্যপূর্ণভাবে তুলে ধরা; অভিযোগকে তদন্তের আগেই প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা নয়।

‎এই প্রতিবেদনের জন্য অভিযুক্ত এপিএস ইউনুসের সঙ্গে ফোন ও বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।